প্রথম আলো প্রকাশ করছে আমার এই লেখাটি, সালেহ ভাই'র কবিতা ভাবনা নিয়ে গদ্য লেখা
পড়ার লিংক : https://www.prothomalony.com/news/4190
কবিতা ভাবনায় নিজস্বতা ও আপন আলোয় উদ্ভাসিত লেখক সালেহ
-ফয়সাল আহমেদ
শিল্প-সাহিত্য সমাজ-সভ্যতা ও নির্দিষ্ট
ভাষায় রচিত হওয়ায় কবিরা বহুমাত্রিক, সৃষ্টিশৈলী প্রয়োগ, লেখার আলাদা ভঙ্গিমা করেছে
তাদের আলাদা, রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল মাইকেল থেকে জীবনানন্দ দাশ-কালের বিবর্তনে যথেষ্ট
পরিবর্তিত,পরিমার্জিত হয়ে বর্তমান রূপ ধারণ করেছে, যেটাকে বলা যায় কবিতার আধুনিক
ধারা বা যুগে পদার্পণ।সাহিত্যের ইতিহাসে উৎপাদিত এই বৈচিত্র্যময় শিল্প শৈলীই বর্তমান
সাহিত্যকে যথেষ্ট সমৃদ্ধ করেছে। এই সমৃদ্ধতা স্রষ্টার দুত কবি-লেখকদের বিচিত্র সৃষ্টির
মধ্য দিয়ে হয়েছে, কবি সেই মানুষ যিনি সাধারণ অভিজ্ঞতা বা অনুভূতি অথবা প্রচলিত শব্দকে
নতুন রূপে উত্তীর্ণ করতে সক্ষম। ইংরেজী শব্দ 'পয়েট' (poet), ল্যাটিন ভাষার প্রথম শব্দরূপ
বিশেষ্যবাচক পুংলিঙ্গ 'পয়েটা, পয়েটে' ('poeta, poetae') (আক্ষরিক অর্থ 'কবি, কবি
এর') থেকে সংকলিত হয়েছে। ফরাসি কবি আর্থার রিমবোঁদ- "কবি" শব্দের লিখিতভাবে
সারাংশ প্রদান করেছেন, “একজন কবি দর্শনীয় মাধ্যম হিসেবে নিজেকে লেখায় ফুঁটিয়ে
তোলেন। তিনি একটি দীর্ঘ, সীমাহীন এবং পদ্ধতিবিহীন, অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় সকলের অবতীর্ণ
হয়ে কবিতা রচনা করেন। সকল স্তরের ভালবাসা, দুঃখ-বেদনা, উন্মত্ততা-উন্মাদনার মাঝে নিজেকে
খুঁজে পান তিনি। তেমনই বহুমাত্রিকতায় নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন আবিষ্কার করেছেন লেখক
কবি আবু আফজাল সালেহ।
আপন সত্ত্বায় ভরকরে নিজের কথা বলার
আলাদা কৌশল, লেখার আলাদা ধারা, ভাবার গভীরতা তৈরি করেছেন মানুষের জীবন প্রবাহ না পাওয়ার ব্যর্থতা পাওয়ার
আশা-আকাঙ্খ, ভালবাসা অনুভুতি সম্পর্ক ,মানুষের ধর্ম, বর্ণ, কর্মধারাও, দেখেন মন খোলা
দৃষ্টিতে।
যেমন: প্রিয়ার নুপুর বাজার শব্দের
মধ্যে অনিন্দ্য সুন্দর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটিয়েছেন কবিতায়,তাকে ধৈর্যশীল হতে শিখিয়েছে:
“ জীবন থেমে থাকে না, থামে না- এলোমেলো হয় মাঝেমধ্যে।
ধৈর্য ধরো,ক্ষমাশীল হও- ক্ষমাশীল
শেখাও ।
হতাশা অভিযোগ ধৈর্যহারা...
বিচ্ছেদ ঘটায়-চাই না এমন ।
তোমার পায়ের নূপুর বাজুক বাজুক তোমার
হাতের চুড়ির নিক্কণ..”|
সাধারন মানুষের দৃষ্টির অগোচরে যা
এড়িয়ে যায়, সালেহ;র দৃষ্টিতে তা ধরা পড়ে। সমাজ সংসারে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা ধারণ
করবে মনের গভীরে । লৌকিক ও সামাজিক জীবনই সষ্টির মহাউপকরণে পরিপূর্ণ, জীবনের নানা চিত্র
কাব্যর মাধ্যমে ফুটিয়েছেন। ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে কেবিতার ছবি,আপন হাতের পরশে
জাদুর মত। সেই চিত্র ফুটে ওঠে প্রতিটি কথা, ভাষা ও পস্থির মাধ্যমে । কখনো বাস্তব কখনও
আবার কল্পনায় ভর করে হেটেছে অনেক দুর।আবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও কবি খুঁজেছেন আলোর
দিশা:
চারিদিকে অন্ধকার...
সুড়ঙ্গপথমুখে আলোর দেখা নেই ।
কাছের লোকগুলোয় বিশ্বাসঘাতক আজ,
যাকে ভালোবাসি-
কাছে ডাকি তার মন অন্যতে- আমাতে নেই,
মুখ আর মুখোশ এক হয়ে গেছে।
সালেহ সকল ধরণের বিষবাষ্পকে নিঃশেষ
করতে পারেন। সেই সাথে পারেন এগুলোর সারাংশকে কবিতা আকারে সংরক্ষণ করতে। অকথ্য দৈহিক
ও মানসিক যন্ত্রণাকে সাথে নিয়ে তিনি অকুণ্ঠ বিশ্বাসবোধ রচনা করে যখন, যেমন, যেখানে
খুশী অগ্রসর হন। একজন অতি মানবীয় শক্তিমত্তার সাহায্যে তিনি সকল মানুষের মধ্যে গুনি
লেখক হিসেবে বিবেচিত।পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনেক কবিকূলের মধ্যে একজন কবি
যিনি তাঁর আলাদা শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গী প্রকাশ করেছেন মাত্র। ম্যারিয়েন মুরে কর্তৃক
কবিদের কাজ সম্পর্কে বলেছেন যে, “ তারা প্রকৃতই সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করেন”।
দেখলাম নুড়ি পাথরের মধ্যেও ঘাস জন্মায়।
গ্রীষ্মের তাপদহে পাহাড়ের বিরাণভূমির
মধ্যে টুকরো টুকরো সবুজ,
ঝিরিঝিরি বাতাসে নুয়ে পড়ে
আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় কচি পাতাগুলো।
---
আমি বারবার যাই, বারবার ফিরি- খুঁজি-ফিরি।
শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
কিংবা শরতের চকচকে নীল আকাশে- শিমুল
তুলার মতো মেঘ হয়ে ভেসে ভেসে।
শান্তির খোঁজে, ভালোবাসার টানে
বারবার যাই, বারবার আসি ফিরে।
প্রকৃতি ও প্রেমের টানে একাকার হয়ে
আলাদা দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ও সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি এই দুটি কবিতায়।
কবির বেদনা-বিদ্ধ হৃদয়ই কবিতার জন্ম-ভূমি।
অর্থাৎ, সময়-বিশেষে কোন একটি বিশেষ সূত্রকে অবলম্বন করে কবির আনন্দ-বেদনা যখন প্রকাশের
পথ পায়, তখন জন্ম। কবি বেদনাকে আস্বাদ্যমান পতিক দান করেন। কবি রাষ্ট্র আর ব্যক্তির
মাঝে যে দন্ধ, এবং দন্ধের মাঝে যে বিকাশ:
কবিতা আর লিখব না !
কবিতা লিখতে বোলো না আমার ।
মানচিত্র ছিঁড়ে খেতে চায় শকুনেরা
!
দেশপ্রেম নেই আজ; শুধুই কাগজে-কলমে।
নিজ স্বার্থের কাছে বিকিয়েছি তা!
কবিতার শব্দগুলো আসে না
এখন বিমুখ কবিতাগুলো দলছুট হরিণের
ন্যায়।
আমরা সবাই রঙিন চশমা পরে-
তাই কবিতার শব্দগুলো আসে না ঠিকমতো
।
-এই পক্তি চিন্তা- চেতনার সৃজনশীল
প্রকাশের মাধ্যমে সার্বজনীন এক আধার। যেখানে লুকায়িত বিরহ, প্রেম, দেশ ব্যক্তি, যুদ্ধ,বিগ্রহ।
আবার সর্বোপরি গণমানুষের বেঁচে থাকার
জীবনের সৌন্দর্য তা প্রকাশ করেছেন ডাল ভতের গানের মাধ্যমে নিঃসন্দেহ গণমানুষের কবি
ডাল ভতের কবি সালেহ।
ডাল-ভাতের গন্ধ
ডাল রাঁধার ঘ্রাণ আসে বাতাসে লোভনীয়
হয়ে
গ্রামের মেয়ে রাঁধে ওই কুটিরে।
তার কাছে যাও
এবং ভাত আর ডালের গন্ধ
শুকে নিয়ে এসো
তারপরে এসো আমার কাছে
ঐশ্বর্য নিয়ে যাও।
আবু আফজাল সালেহ কবিতার মধ্যে বহুমাত্রিকতা
বৈচিত্রতা রয়েছে। কাঠামোর বিচারে কবিতা নানা রকম। যুগে যুগে কবিরা কবিতার বৈশিষ্ট্য
ও কাঠামোতে পরিবর্তন এনেছেন। কবিতা শিল্পের মহত্তম শাখা পরিগণিত। তেমনি কবিতা শিল্পের
অগ্র-পথিক সালেহ অতঃপর স্থান কাল পাত্র ভেদে একজন সার্বজনীন পয়গম্বর। যিনি তার দার্শনিক
দৃষ্টিতে কলমের খোঁচায় সত্যকে নির্মমভাবে উপস্থাপন করেন । সত্য, সুন্দর, ও মঙ্গলের
পূজারী অর্থাৎ সালেহ মানুষের,মানবতার, অমোঘ সত্যর নির্দেশক।
অন্যতম প্রধান কবি রূপসী বাংলার কবি
বলে খ্যাত জীবনানন্দ দাশ, তিনি যেমন কবিতার সাথে প্রকৃতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন,আবার নজরুল
সুকান্ত মানবতার জয়গান গেয়েছেন অবিশ্রান্ত। অন্যদিকে রবি ঠাকুর হয়েছেন সাহিত্যর প্রবাদপ্রতিম
পুরুষ। ঐতিহাসিক যেমন ইতিহাসের নিদর্শনকে বিশ্লেষণ করে ইতিহাসকে করেন পূর্ণাঙ্গ, ঠিক
তেমনিই ধিরে ধিরে সালেহ সার্বজনীন সভ্যতা গড়ার অন্যতম সারথি হয়ে উঠছেন।
ওহ, স্বাধীনতা
সোনারোদ বলে ওঠে,
স্বাধীনতা শীতরোদ মেখে শিশু বলে,
স্বাধীনতা।
মুক্ত বিহঙ্গের ধূসর ডানায় সোনা
ঝিলিমিল
বলে, 'এসো, স্বাধীনতা'।
সোনা-অক্ষরে স্বাধীনতা
শাপলা হেলেঞ্চা পদ্মর জলে স্বাধীনতা
দোয়েলের শিসে স্বাধীনতা
পোয়াতি বউ, আসাদের শার্ট, মতিউরেরা
বেলে মাঠ,
জ্যোৎস্নামাখা সোনালিখেত পদ্মা-ধরলা-কর্ণফুলীর
কলধ্বনি
স্বাধীনতা-স্বাধীনতা।
সুন্দরবন, কক্সবাজার,
থানচি
জকিগঞ্জ, টেকনাফ, তেঁতুলিয়া, শ্যামনগর
কোরাস সুরে গেয়ে ওঠে,
স্বাধীনতা-স্বাধীনতা।
যার কবিতার মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছেন দেশপ্রেম, মানবিক প্রেম, প্রকৃতি, ভালোবাসা ও দর্শন, সৃষ্টিশীলতা ও মানবিকতায় হয়তো ভালো লেখার পাথেয়; আধুনিক গদ্য কবিতা যার হাতে হয়ে উঠছে অনবদ্য। কবিতায় হয়ে উঠেছেন অনেক বেশি সমৃদ্ধ যার কবিতার সহজ সরল স্বীকারোক্তি প্রকাশ করে আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি এবং নান্দনিক সৌন্দর্যের আলাদা কৌশল, সাবলীল সরল ভাষায় আলাদাভাবে চেনা যায় তার কবিতা। কবিতা ভাবনায় নিজস্বতা আপন আলোয় উদ্ভাসিত লেখক সালেহ এই নিজস্বতায় ভর করে কবিতার এই পথিক হাঁটবেন হয়তো বহুদূর। একের পর এক কবিতা প্রবন্ধ, লিটল ম্যাগাজিন সহ সমস্ত পত্রপত্রিকায় লেখা প্রকাশ হচ্ছে। লেখক তাঁর এই পথ চলার স্বরূপ বোঝাচ্ছে নান্দনিকভাবে হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন অনিন্দ্যসুন্দর সাহিত্যের ক্যানভাসে জায়গা করে নেবে একটি নক্ষত্র।#
ফয়সাল আহমেদ
কবি ও সম্পাদক বাংলাচারু সাহিত্য
পত্রিকা।
সাংগঠনিক সম্পাদক: ঢাকা সাহিত্য পরিষদ
