মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের যুবশক্তি -ফয়সাল আহমেদ
ফয়সাল আহমেদ এর লেখালেখির ডিজিটাল খেরোখাতা
---
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের যুবশক্তি
- ফয়সাল আহমেদ
যুগে যুগে জগতে গীত শুয়েছে যুবক ও তারুণ্যের জয়গান। অসম্ভবকে সম্ভব করতে ঝুঁকি নিতে পারে শুধু যুবকরা। তরুণ বিক জোয়াদের অসাধ্য কিছু নেই। তেমনি আমরা অসাধ্যকে সাধন করেছিলাম ৭১ স্বাধীনতা যুদ্ধে, বঙ্গবন্ধুর ডাকে দুঃসাহস দেখিয়ে ছিলো যুবকরা এক বুক সাহস নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রয়ে। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম।
অসম্ভবের অভিযানে এরা চলে, না চলেই ভীরু ভয়ে লুকায় অঞ্চলে
এরা অকারণ দুর্নিবার প্রাণের ঢেউ, তবু ছুটে চলে যদিও দেখেনি সাগর কেউ।
কবির এসব কথা যে স্রেফ ভাবাবেগ তা কিন্তু নয়, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ ও ৬৪'র শিক্ষা কমিশন বিরুদ্ধে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফার আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে ১১ দফার আন্দোলন '৬৯ এর গণ আন্দোলন, ১৯৭০ এর নির্বাচন, ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণ করে এক অভূতপূর্ব অবদান রাখে এই যুব সমাজ।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন বাঙ্গারী জাতীর এক সাহসী অধ্যায়, আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণে এই যুদ্ধ পরিণত হয়েছিল সর্বজনের। যুদ্ধে ৮০ ভাগের বেশি ছিল যুবক। তাদের রক্ত ও জীবন বলিদানে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, মানচিত্র, পতাকা, সগৌরবে এগিয়ে যাচ্ছে জাতি, স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ তিথিতে ও বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ উদযাপন করেছি আমরা। আমাদের এই গৌরব মাথা উচু করে দাঁড়াবার। স্বাধীনতা শব্দটি শব্দটি কীভাবে আমাদের হলাে একটু জেনে নেওয়া যাক।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলাে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগােষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে নানাভাবে শােষণ করতে থাকে। ১৯৪৮ সালে মাত্র ২৮ বছরের যুবক বঙ্গবন্ধুই তখনকার পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতারক নেতৃত্বের বৈষম্যমূলক আচরণ দেখে প্রথম প্রতিবাদ করেছিলেন। দাবি তুলেছিলেন একটি নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের। মাতৃভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করে ১৯৫২ সালে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা চালায়। এর প্রতিবাদে শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। এই আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে নিজের জীবন দান করে। লিখে গেল বাংলা ভাষার বর্ণমালা একদল যুবক- রফিক, শফিক, জব্বার, কামাল, শফিউল্লাহ, আরাে অনেক। ভাষা। আন্দোলনের পর থেকে বাঙালি জাতি তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ক্রমাগত সংঘবদ্ধ হতে থাকে। জাতির বিভিন্ন দুঃসময়ে যে একত্র ও সংঘবদ্ধ হতে পেরেছিল তার মূল প্রেরণাই ছিল এদেশের যুব
১৯৭১ সালের মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকেই উত্তাল হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। ১ মার্চ দুপুরে যুব ও ছাত্ররাও পথে নেমে আসে। তারা শ্লোগান দেন ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর , বাংলাদেশ স্বাধীন কর'। শ্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে ঢাকার রাজপথ। ২ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র সভায় দেশের পতাকা প্রথম উত্তোলনের মাধ্যমে এই মুক্তির মহান আন্দোলনে। ছাত্র ও যুব সমাজ তাদের অগ্রণী ভূমিকার যাত্রা শুরু করে।
![]() | |
|
২৫ মার্চ ১৯৭১ এর কালাে রাত্রে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের নিধনযজ্ঞ কর্মকান্ড এর মাধ্যমে এদেশের জনগনের কণ্ঠস্বর শুদ্ধ। করতে চায়। ২৬ শে মার্চ বাংলার ছাত্র-যুবক, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের জনগণ বর্বর হানাদার পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।এই ভয়ংকর পরিস্থিতির মধ্যে সংকটকালীন সময়ে যুব সমাজ সংগঠিত হয়ে সর্বোচ্চ সাধ্যমত প্রতিরােধ আন্দোলন গড়ে তােলে। মুক্তিযুদ্ধকালে অসংখ্য ছাত্র ও যুবকরা বিভিন্নভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে বিভিন্ন শিবিরে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং প্রশিক্ষণ শেষে সম্মুখ সমরে ঝাঁপিয়ে পড়ে যুবসমাজ।।
স্বাধীনতা যুদ্ধে ঢাকা শহরে যুবকদের গেরিলা আক্রমণ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য গেরিলারা সাধারণত কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত ব্যবহার করত। ঢাকার গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করা হত “ক্র্যাক প্লাটুন” নামক গেরিলা গ্রুপের মাধ্যমে। এই আক্রমণের মূল কাজ ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। ৯ জুন ১৯৭১ তৎকালীন ইন্টারকন্টিনেন্টাল হােটেলে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটানাের মাধ্যমে এই আক্রমণের সূচনা করা হয়।
থিদ্ধে অংশগ্রহণকারী নেী কমান্ডারদের অবদান কম নয়। পাকিস্তান নৌ বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত বাঙ্গালী অনেক সাব মেরিনার a ‘ময় ফ্রান্সে প্রশিক্ষণরত ছিল। প্রশিক্ষণ অসম্পূর্ণ রেখে এরা দেশে ফিরলে সাথে পাকিস্তান নৌবাহিনী ছেড়ে আসা।
পুলসংখ্যক নাবি ও নন কমিশন্ড অফিসারদের নিয়ে গঠন করা হয় ১০ সেক্টর। ভারতীয় নৌ বাহিনীর সহায়তায় তাগীরথী নদীর তীরে পলাশী এলাকায় একটি নৌবাহিনী প্রশিক্ষণ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ভালাে সাঁতার জানা ১৫০ জন মুখকে এখানে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ১৪ আগষ্ট ১৯৭১ পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে এ সকল নৌ সেনারা শত্রদের যুদ্ধজাহাজসহ সমুদ্রগামী অনেক জাহাজ ধবংস করে। অক্টোবর ১৯৭১ সালে অনুরূপ আরও অপারেশনে শত্রু বাহিনীর অসংখ্য জাহাজ ধবংস করে।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন শ্রেণীর লােকদের ভূমিকা যেমন অনেক তেমনি তরুণ টগবগে যুব সমাজের ভূমিকাও কম নয়। দেশের প্রত্যেকটি আন্দোলনে এই যুব সমাজ সবসময় থেকেছে সবার আগে। মুক্তিযুদ্ধেও তাদের অবদান অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধে যুব ও ছাত্র সমাজের প্রায় ২৮ হাজার নেতাকর্মীসহ ৩০ লাখ শহীদ হয়েছেন। ২ লাখ মাবােন সম্ভ্রম হারিয়েছেন। পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন লাখের অধিক।।
কষ্ট ত্যাগের বিনিময় এসেছে এই স্বাধীনতা, এই স্বাধীনতা রক্ষার দায় যুব সমাজের উপরই বর্তায়। স্বাধীনতার ঝান্ডা হাতে নিয়ে এগিয়ে যাবে আগামীর পথে এই যুব সমাজ।
কবি বলেছেন, স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন।
বতর্মানে উদ্যোগী যুবকদের হাত ধরে পাল্টে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চিত্র। জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতি যুব সমাজের আরাে সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরী। যুবসমাজের মেধা, সৃজনশীলতা, সাহস ও প্রতিভাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে একটি জাতির অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিমন্ডল। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশও যুব সমাজ জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার, নীতি নির্ধারক ও সিদ্বান্ত গ্রহণকারী। তাই যুবশক্তিকে যথাযথ পন্থায় কাজে লাগালে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
কে আছ জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ বিশ্বের মানচিত্রে সার্বভৌম বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। তার মূলে কাজ করেছে জাগ্রত যুব সমাজের গৌরবদীপ্ত সংগ্রাম। তাই দেশ গঠনে যুব সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশ গঠনের সুকঠিন পবিত্র দায়িত্ব পালন করতে হবে অতঃপর আমাদের অনেক দূর যেতে হবে।।
লেখক: ফয়সাল আহমেদ (কবি ও লেখক)
Post a Comment
Post a Comment

