Please wait a moment. Click the button below if the link was created successfully.
কবি হওয়ার আবেগ অনেকের মধ্যেই কাজ করে। অনেকে চেষ্টা বা সাধনা করেন, কিন্তু সকলের সাধনার প্রতিফলন ঘটে না। সৃষ্টির জন্য দরকার সৃষ্টিশীল প্রতিভা, আর সেই প্রতিভার সমৃদ্ধির জন্য দরকার কঠিন সাধনা; তবেই কবিতার ভুবনে প্রবেশ করা সম্ভব হয়। সততা, নিষ্ঠা, গভীর মনোনিবেশের মাধ্যমে একজন শুদ্ধসত্তার মালিক হতে হয়, তবেই কবিতাকে ছুঁয়ে দেখা যায়। শুদ্ধ চর্চার ফলে পবিত্র সত্তায় আলোর বিকিরণ ঘটে। সেই আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আত্মিক শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হয়। সেই শক্তির বলে জগৎকে দেখার জন্য কবির একটি আলাদা দৃষ্টি থাকতে হয়। দেশ, জাতি ও সমাজকে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখানোই কবির কাজ। নিজেকে মানবকল্যাণে নিবেদিত করা কবি-সাধকের কর্তব্যের মধ্যেই পড়ে। প্রকৃত লেখক সুনাম অর্জন বা বাহবা পাওয়ার জন্য লেখেন না, তিনি মানবকল্যাণকে প্রভাবিত করার জন্যই লেখেন। শখের বশে কয়েকটি কবিতা লিখলেই বা কবিতার প্রচারে পাগল হলেই কবিতার অনুরাগী হওয়া যায় মাত্র, কিন্তু কবিতার দূরদর্শী সাধক হওয়া যায় না। অনেকেই অল্প দিনেই কবি পরিচিতি পেতে চায়, কিন্তু প্রকৃত কবিরা পরিচয়ের আশায় থাকেন না; কাজের মাধ্যমেই তাঁদের পরিচয় তৈরি হয়।
কবির নিজের কাজ নিয়ে আত্মসমালোচনা থাকা দরকার। কবিতা শুদ্ধভাবে রচিত হচ্ছে কিনা, সেদিকে ধ্যান রাখতে হয়। যদি তা সম্ভব না-ও হয়, তবে ভবিষ্যতে কীভাবে তা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সাধকের মধ্যে আত্মসমালোচনামূলক চেতনা থাকতে হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু মানুষকে ভাবুকমনা করে তোলে এবং কবি হওয়ার জন্য আবেগ সৃষ্টি করে। এ দেশকে বাউল, কবি ও সাধকের দেশ বলা হয়। এ দেশের মাটি, জল, হাওয়া কবি হওয়ার জন্য অত্যন্ত প্রণোদনা জোগায়। কিন্তু সকলে কবি হয়ে ওঠেন না। কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, “সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।” কাল ও যুগের ধারাবাহিকতায় প্রকৃত কবির সংখ্যা খুবই কম।
কবি হওয়ার জন্য শৈশব থেকে স্বপ্ন ও সাধনা থাকতে হয়। সূর্যোদয়ের সময় যেমন নতুন দিনের সূত্রপাত হয়, তেমনি জীবনের প্রভাতবেলাতেই এ বিচিত্র পথে চলার আবেগ থাকতে হয়। নিজেকে স্বপ্নের পথে চলার উপযুক্ত করে তৈরি করতে হয়। বিচিত্র সাহিত্য সম্পর্কে জানতে হয় এবং অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে হয়। প্রাচীন থেকে আধুনিক যুগ পর্যন্ত সব প্রধান কবির কবিতা পড়ে তাঁদের ভাবশক্তি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে অনুধাবন করতে হয়। আপন সত্তায় সেই ভাবনাকে পোষণ করে নিজের কথা বলার আলাদা কৌশল, লেখার স্বতন্ত্র ধারা এবং ভাবনার গভীরতা তৈরি করতে হয়।
মানুষের জীবনপ্রবাহ, না পাওয়ার বেদনা, পাওয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা ও অনুভূতি সম্পর্কে জানতে হয়। মানুষের ধর্ম, বর্ণ ও কর্মধারাকে খোলা দৃষ্টিতে দেখতে হয়। সাধারণ মানুষের দৃষ্টির অগোচরে যা এড়িয়ে যায়, কবির দৃষ্টিতে তা-ই ধরা পড়ে। সমাজ-সংসারে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা কবি তাঁর মনের গভীরে ধারণ করেন। লৌকিক ও সামাজিক জীবনই সৃষ্টির মহাউপকরণে পরিপূর্ণ। জীবনের নানা চিত্র কাব্যের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা যায়। কাব্যে ছবি ফুটিয়ে তুলতে হয় আপন হাতের স্পর্শে, জাদুর মতো। সেই চিত্র ফুটে ওঠে প্রতিটি কথা, ভাষা ও পঙ্ক্তির মাধ্যমে। কখনো বাস্তব, কখনো আবার কল্পনায় ভর করে অনেক দূর হাঁটা যায়। তবে লেখকের সেই পথচলার রূপকে প্রকাশ্যে বোঝাতে হয়। যে প্রকাশ ঘটে মনের গভীর থেকে, তা হৃদয় থেকে হৃদয়ে ছুঁয়ে যায়; কবির মন থেকে ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মনে। এভাবেই আপন সত্তায় ভর করে ভাবনার জগতে কবিসত্তা বিচরণ করে, অতঃপর কবি আত্ম-অতিক্রমে জেগে ওঠেন এক মহাসাধক হয়ে।